‘জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ’ বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ
- Update Time : 06:57:06 pm, Saturday, 7 February 2026
- / 78 Time View
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বিজিএমইএ জানায়, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পরিবার জাপান সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
সংস্থাটি জানায়, শুক্রবার জাপানের টোকিওতে স্বাক্ষরিত এই ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ)’ বাংলাদেশের বাণিজ্য কূটনীতিতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন।
পণ্য ও সেবা বাণিজ্য অন্তর্ভুক্ত করে সাত দফা আলোচনার মাধ্যমে এ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে, যা পারস্পরিকভাবে লাভজনক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা গভীর করার যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
জাপান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার। দেশটির সর্ববৃহৎ ওডিএ (অফিসিয়াল ডেভলভমেন্ট অ্যাসিসট্যান্স) প্রদানকারী হিসেবে জাপানের অবদান বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বস্ত অংশীদারিত্বের স্বাভাবিক অগ্রগতি। আজ বিজিএমইএ’র এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এই দূরদর্শী উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে বিজিএমইএ। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির এই সময়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে জাপান-বাংলাদেশ ইপিএ অত্যন্ত কৌশলগত ও সময়োপযোগী।
বাণিজ্যিক দিক থেকে এই ইপিএ বাংলাদেশের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের বাজারে প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে ১ হাজার ৪১১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যেখানে জাপানের বৈশ্বিক মোট পোশাক আমদানি প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
একক বাজার হিসেবে বিবেচনায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ। এত বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ জাপানে যায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের এই শেয়ার অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করাকে একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত।
ইপিএর প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত সহায়ক, কারণ এতে নিরবচ্ছিন্ন শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অনুকূল ‘রুলস অব অরিজিন’ বজায় রাখা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ জিএসপি স্কিমের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। এলডিসি উত্তরণের পর ইপিএ না থাকলে বাংলাদেশকে ৮ থেকে ১৫ শতাংশ (নিটওয়্যার) এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি (ওভেন) শুল্ক দিতে হতো। এই চুক্তির ফলে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই সব ধরনের পোশাক পণ্যের ওপর শুল্ক পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে।
এছাড়া, চুক্তির ৩ নম্বর অধ্যায় ও ২ নম্বর অ্যানেক্স অনুযায়ী, ‘সিঙ্গেল স্টেজ’ বা এক স্তর বিশিষ্ট প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত পোশাকও জাপানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এটি বর্তমান জিএসপি নিয়মের মতোই সহজ।
ইপিএ অনুকূল ও পূর্বানুমেয় বাণিজ্য পরিবেশ তৈরি করায়, এর সুফল ও সম্ভাবনাকে দেশের ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরোপুরি কাজে লাগাতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন এখন অত্যাবশ্যক।
বর্তমানে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, বিজিএমইএ বিশ্বাস করে, ইপিএ এই ব্যবধান কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করবে এবং জাপানি পোশাক আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করবে।
বিজিএমইএ মনে করে, জাপানের সঙ্গে এই ইপিএ বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতিতে একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা করবে। এটি এলডিসি-পরবর্তী সময়ে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি পথপ্রদর্শক বা ‘গাইডিং লাইট’ হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)-এর সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত সব পক্ষকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের মাধ্যমে শূন্য শুল্ক সুবিধা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুতি নিতে পারে।
























