Dhaka 1:02 pm, Sunday, 1 February 2026

১৪ হাজার সাংবাদিকের তথ্য ফাঁস: নির্বাচন কমিশনের চরম অব্যবস্থাপনা ও দায় এড়ানোর অপচেষ্টা

অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : 01:24:25 am, Sunday, 1 February 2026
  • / 160 Time View
১৬৯

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের এক ভয়াবহ ডিজিটাল কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এসেছে। প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি ‘টেকনিক্যাল ত্রুটি’ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার নগ্ন ও অমার্জনীয় উদাহরণ।

সাংবাদিকদের কার্ড ও গাড়ির স্টিকার প্রদানের প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করে অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়। সাংবাদিক সমাজের আপত্তি, নিরাপত্তা সংশয় এবং যৌক্তিক প্রশ্ন উপেক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। পরে সমালোচনার মুখে কমিশন পিছু হটে। কিন্তু ততক্ষণে প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ই-মেইলসহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য ওয়েবসাইটে জমা দিয়েছেন।

শনিবার বিকেল চারটার দিকে দেখা যায়—কোনো লগইন, পাসওয়ার্ড বা অথেনটিকেশন ছাড়াই পুরো আবেদন তালিকা ওয়েবসাইটের হোম পেজে উন্মুক্ত। যে কেউ প্রবেশ করে সম্পূর্ণ তথ্য দেখতে এবং আবেদন ফাইল খুলতে পারছিল। এটি কেবল গাফিলতি নয়; এটি প্রাথমিক ডাটা সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির প্রমাণ।

এখন প্রশ্নগুলো আরও জোরালো—
ডাটা প্রোটেকশন, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ও বেসিক সিকিউরিটি টেস্টিং ছাড়া কীভাবে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এমন সিস্টেম চালু করে?
আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
অনলাইন কার্যক্রম স্থগিতের পর কে, কীভাবে এবং কার অনুমতিতে পুরো ডাটাবেস উন্মুক্ত করল?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই তথ্যগুলো ইতোমধ্যে কপি বা ডাউনলোড হয়েছে কি না, তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে গেছে কি না—সে বিষয়ে কমিশনের কোনো স্পষ্ট জবাব নেই।
জনসংযোগ শাখার “অ্যাডমিন ওপেন করেছিলেন” ব্যাখ্যা দায়িত্ব এড়ানোর অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ‘অ্যাডমিনের ভুল’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলা যায় না। এখানে দায় প্রতিষ্ঠানটির, নীতিনির্ধারকদের এবং নেতৃত্বের।

এই ঘটনা কেবল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেনি; এটি রাষ্ট্রীয় ডাটা ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ দুর্বলতাও উন্মোচিত করেছে। আজ সাংবাদিকদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর ফাঁস হয়েছে। কাল যদি ভোটার তালিকা বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অন্য সংবেদনশীল তথ্য একইভাবে উন্মুক্ত হয়—তখন দায় নেবে কে?

এখনই নির্বাচন কমিশনের উচিত—
১. অবিলম্বে স্বাধীন ডিজিটাল ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা।
২. ঠিক কত তথ্য কত সময় উন্মুক্ত ছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৩. দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
নচেৎ এই ঘটনাও অন্য অনেক ঘটনার মতো “দুঃখ প্রকাশ” আর “তদন্ত চলছে”র ফাইলে চাপা পড়ে যাবে।
এটি প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়—
এটি জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের চরম ব্যর্থতা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

১৪ হাজার সাংবাদিকের তথ্য ফাঁস: নির্বাচন কমিশনের চরম অব্যবস্থাপনা ও দায় এড়ানোর অপচেষ্টা

Update Time : 01:24:25 am, Sunday, 1 February 2026
১৬৯

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের এক ভয়াবহ ডিজিটাল কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এসেছে। প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি ‘টেকনিক্যাল ত্রুটি’ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার নগ্ন ও অমার্জনীয় উদাহরণ।

সাংবাদিকদের কার্ড ও গাড়ির স্টিকার প্রদানের প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করে অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়। সাংবাদিক সমাজের আপত্তি, নিরাপত্তা সংশয় এবং যৌক্তিক প্রশ্ন উপেক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। পরে সমালোচনার মুখে কমিশন পিছু হটে। কিন্তু ততক্ষণে প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, মোবাইল নম্বর, ই-মেইলসহ অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য ওয়েবসাইটে জমা দিয়েছেন।

শনিবার বিকেল চারটার দিকে দেখা যায়—কোনো লগইন, পাসওয়ার্ড বা অথেনটিকেশন ছাড়াই পুরো আবেদন তালিকা ওয়েবসাইটের হোম পেজে উন্মুক্ত। যে কেউ প্রবেশ করে সম্পূর্ণ তথ্য দেখতে এবং আবেদন ফাইল খুলতে পারছিল। এটি কেবল গাফিলতি নয়; এটি প্রাথমিক ডাটা সুরক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির প্রমাণ।

এখন প্রশ্নগুলো আরও জোরালো—
ডাটা প্রোটেকশন, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ও বেসিক সিকিউরিটি টেস্টিং ছাড়া কীভাবে একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এমন সিস্টেম চালু করে?
আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
অনলাইন কার্যক্রম স্থগিতের পর কে, কীভাবে এবং কার অনুমতিতে পুরো ডাটাবেস উন্মুক্ত করল?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—এই তথ্যগুলো ইতোমধ্যে কপি বা ডাউনলোড হয়েছে কি না, তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে গেছে কি না—সে বিষয়ে কমিশনের কোনো স্পষ্ট জবাব নেই।
জনসংযোগ শাখার “অ্যাডমিন ওপেন করেছিলেন” ব্যাখ্যা দায়িত্ব এড়ানোর অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ‘অ্যাডমিনের ভুল’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলা যায় না। এখানে দায় প্রতিষ্ঠানটির, নীতিনির্ধারকদের এবং নেতৃত্বের।

এই ঘটনা কেবল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেনি; এটি রাষ্ট্রীয় ডাটা ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ দুর্বলতাও উন্মোচিত করেছে। আজ সাংবাদিকদের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর ফাঁস হয়েছে। কাল যদি ভোটার তালিকা বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অন্য সংবেদনশীল তথ্য একইভাবে উন্মুক্ত হয়—তখন দায় নেবে কে?

এখনই নির্বাচন কমিশনের উচিত—
১. অবিলম্বে স্বাধীন ডিজিটাল ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা।
২. ঠিক কত তথ্য কত সময় উন্মুক্ত ছিল, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৩. দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
নচেৎ এই ঘটনাও অন্য অনেক ঘটনার মতো “দুঃখ প্রকাশ” আর “তদন্ত চলছে”র ফাইলে চাপা পড়ে যাবে।
এটি প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়—
এটি জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের চরম ব্যর্থতা।