Dhaka 9:52 pm, Tuesday, 13 January 2026
আইনের নামে প্রকাশ্য তামাশা

মেঘনায় সংঘটিত অপরাধের মামলা সোনারগাঁও থানায়, থানার এখতিয়ার ভেঙে বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 04:42:49 pm, Tuesday, 13 January 2026
  • / 159 Time View
১৭২

আইনের শাসন, ভৌগোলিক এখতিয়ার ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে উপহাস করে এক নজিরবিহীন ঘটনায় কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনার মামলা দায়ের করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায়। আইনজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়—বরং বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

ভুয়া তথ্য দিয়ে মামলা সাজানোর অভিযোগঃ

অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ঘটনাস্থল, বাস্তব প্রেক্ষাপট ও সত্য আড়াল করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য সংযোজন করে মামলা সাজানো হয়েছে। বিষয়টি সরাসরি আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনা মেঘনায়, অভিযোগ সোনারগাঁওয়েরঃ

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের রামপ্রসাদের চর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের একাধিক ব্যক্তি আহত হন। অথচ রহস্যজনকভাবে সেই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়—লায়লা জামান মিলন নামের এক নারী নিজ বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে যাওয়ার পথে সাহাপুর কাঠপট্টি এলাকায় হামলার শিকার হন। অভিযোগে দাবি করা হয়, তাকে মারধর করে একটি আইফোন মোবাইল ও স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আইনের মৌলিক নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘনঃ

অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—অভিযোগপত্রে বর্ণিত সময়, স্থান ও ঘটনা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আইন অনুযায়ী, যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়, মামলা দায়ের করতে হয় সেই এলাকার থানায়। অথচ এ ঘটনায় সেই মৌলিক আইনি নীতিকেই পরিকল্পিতভাবে পদদলিত করা হয়েছে।

একই সময়, দুই জেলা, দুই মামলা!

অভিযুক্তদের দাবি, একই দিন ও একই সময়ে দুই ভিন্ন জেলায় দুই ভিন্ন ধরনের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ যুক্তি, আইন ও বাস্তবতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের ভাষায়, এটি একটি সাজানো, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো এবং প্রকৃত সংঘর্ষের ঘটনা আড়াল করা।

দুটি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ওই সংঘর্ষের ঘটনায় আলাল মিয়া ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) মেঘনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অথচ বিস্ময়করভাবে, একই তারিখ ও একই সময় দেখিয়ে সাতজনকে আসামি করে পরদিন সোমবার (৫ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলার সময় এক হলেও স্থান, ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গুরুতর জালিয়াতি এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার স্পষ্ট নজির।

আসামিদের পরিচয়ঃ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার এজাহারনামীয়
১নং আসামি ঢাকার চকবাজারে একটি পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত, ২নং আসামি একজন কাঠমিস্ত্রি, ৪নং আসামি সদ্য প্রবাস ফেরত, ৬নং আসামি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক এবং ৭নং আসামিও সদ্য প্রবাস ফেরত ব্যক্তি।

সংঘর্ষে দু’পক্ষই আহত—স্থানীয়দের বক্তব্যঃ

সরেজমিনে রামপ্রসাদের চর গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে আলাল মিয়া ও লায়লা জামান মিলন দুজনই ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত সংঘর্ষের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লায়লা জামান মিলনকে ‘পথে হামলার শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করে তার বড় ছেলে মাজহারুল ইসলাম তুহিন ইচ্ছাকৃতভাবে মেঘনা থানায় মামলা না করে সোনারগাঁও থানায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যঃ
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল জলিল বলেন,“যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করা হয়েছে, তাহলে অভিযুক্তদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।”তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“যে কেউ মামলা করতে পারে। মামলা দায়েরের পর তদন্তের মাধ্যমেই সত্য উদঘাটন করা হয়।”

সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভঃ
স্থানীয় সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি শুধু থানার এখতিয়ার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়—বরং আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটি ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত। অবিলম্বে উভয় মামলার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা দায়েরকারীদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আইনের নামে প্রকাশ্য তামাশা

মেঘনায় সংঘটিত অপরাধের মামলা সোনারগাঁও থানায়, থানার এখতিয়ার ভেঙে বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি

Update Time : 04:42:49 pm, Tuesday, 13 January 2026
১৭২

আইনের শাসন, ভৌগোলিক এখতিয়ার ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রকাশ্যে উপহাস করে এক নজিরবিহীন ঘটনায় কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনার মামলা দায়ের করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায়। আইনজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়—বরং বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

ভুয়া তথ্য দিয়ে মামলা সাজানোর অভিযোগঃ

অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ঘটনাস্থল, বাস্তব প্রেক্ষাপট ও সত্য আড়াল করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া তথ্য সংযোজন করে মামলা সাজানো হয়েছে। বিষয়টি সরাসরি আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনা মেঘনায়, অভিযোগ সোনারগাঁওয়েরঃ

মামলা সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের রামপ্রসাদের চর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের একাধিক ব্যক্তি আহত হন। অথচ রহস্যজনকভাবে সেই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়—লায়লা জামান মিলন নামের এক নারী নিজ বাড়ি থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে যাওয়ার পথে সাহাপুর কাঠপট্টি এলাকায় হামলার শিকার হন। অভিযোগে দাবি করা হয়, তাকে মারধর করে একটি আইফোন মোবাইল ও স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আইনের মৌলিক নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘনঃ

অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—অভিযোগপত্রে বর্ণিত সময়, স্থান ও ঘটনা বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আইন অনুযায়ী, যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়, মামলা দায়ের করতে হয় সেই এলাকার থানায়। অথচ এ ঘটনায় সেই মৌলিক আইনি নীতিকেই পরিকল্পিতভাবে পদদলিত করা হয়েছে।

একই সময়, দুই জেলা, দুই মামলা!

অভিযুক্তদের দাবি, একই দিন ও একই সময়ে দুই ভিন্ন জেলায় দুই ভিন্ন ধরনের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগ যুক্তি, আইন ও বাস্তবতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। তাদের ভাষায়, এটি একটি সাজানো, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো এবং প্রকৃত সংঘর্ষের ঘটনা আড়াল করা।

দুটি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ওই সংঘর্ষের ঘটনায় আলাল মিয়া ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) মেঘনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অথচ বিস্ময়করভাবে, একই তারিখ ও একই সময় দেখিয়ে সাতজনকে আসামি করে পরদিন সোমবার (৫ জানুয়ারি) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলার সময় এক হলেও স্থান, ঘটনা ও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গুরুতর জালিয়াতি এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার স্পষ্ট নজির।

আসামিদের পরিচয়ঃ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মামলার এজাহারনামীয়
১নং আসামি ঢাকার চকবাজারে একটি পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত, ২নং আসামি একজন কাঠমিস্ত্রি, ৪নং আসামি সদ্য প্রবাস ফেরত, ৬নং আসামি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক এবং ৭নং আসামিও সদ্য প্রবাস ফেরত ব্যক্তি।

সংঘর্ষে দু’পক্ষই আহত—স্থানীয়দের বক্তব্যঃ

সরেজমিনে রামপ্রসাদের চর গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে আলাল মিয়া ও লায়লা জামান মিলন দুজনই ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত সংঘর্ষের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লায়লা জামান মিলনকে ‘পথে হামলার শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করে তার বড় ছেলে মাজহারুল ইসলাম তুহিন ইচ্ছাকৃতভাবে মেঘনা থানায় মামলা না করে সোনারগাঁও থানায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা দায়ের করেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যঃ
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল জলিল বলেন,“যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করা হয়েছে, তাহলে অভিযুক্তদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।”তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“যে কেউ মামলা করতে পারে। মামলা দায়েরের পর তদন্তের মাধ্যমেই সত্য উদঘাটন করা হয়।”

সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভঃ
স্থানীয় সচেতন মহল ও আইন বিশেষজ্ঞরা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি শুধু থানার এখতিয়ার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়—বরং আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার একটি ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত। অবিলম্বে উভয় মামলার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা দায়েরকারীদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা সতর্ক করেছেন।