Dhaka 7:42 am, Tuesday, 13 January 2026

আর কখনো যাতে ভোট ডাকাতি না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান প্রধান উপদেষ্টার

অগ্নিশিখা অনলাইন
  • Update Time : 10:00:27 pm, Monday, 12 January 2026
  • / 29 Time View
৩৭

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর তদন্ত প্রতিবেদন আজ সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন।

বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এবং সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপন, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও ড. মো. আব্দুল আলীম।

উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭টি আসনে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ ভোট হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।

প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মতো করে কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে। এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছু করতে পারেনি। জনগণ যেন অন্তত কিছুটা স্বস্তি পায়, সে জন্য যারা জড়িত ছিল, তাদের চেহারা সামনে আনতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল— তা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা ছিল। এর ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে নেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল।

২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এ সময় কমিশনের বদলে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তিতে পরিণত হয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

আর কখনো যাতে ভোট ডাকাতি না হয় সে ব্যবস্থা গ্রহণের আহবান প্রধান উপদেষ্টার

Update Time : 10:00:27 pm, Monday, 12 January 2026
৩৭

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর তদন্ত প্রতিবেদন আজ সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন।

বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এবং সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপন, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও ড. মো. আব্দুল আলীম।

উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭টি আসনে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ ভোট হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতেই এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।

প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মতো করে কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে। এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছু করতে পারেনি। জনগণ যেন অন্তত কিছুটা স্বস্তি পায়, সে জন্য যারা জড়িত ছিল, তাদের চেহারা সামনে আনতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল— তা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা ছিল। এর ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর কৌশল নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে নেওয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিত ছিল।

২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যত নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। এ সময় কমিশনের বদলে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তিতে পরিণত হয়।